google.com, pub-4851514572944618, DIRECT, f08c47fec0942fa0

অথর্ববেদকে কি ত্রয়ীর অন্তর্গত কিনা ? অথর্বসংহিতার গঠন ও বিষয়বস্তু

অথর্ববেদকে কি ত্রয়ীর অন্তর্গত বলা চলে? অথর্বসংহিতার গঠন ও বিষয়বস্তু আলোচনা কর।

অথর্ববেদ ত্রয়ীর অন্তর্গত কিনা আলোচনা

বেদ শব্দের বিভিন্ন প্রতিশব্দ আছে।যেমন- শ্রুতি,ত্রয়ী, ত্রয়ী, আগম ইত্যাদি। বেদ চারটি- ঋক,সাম,যজুঃ, অথর্ব। কিন্তু বেদকে যখন ত্রয়ী বলা হয়, তখন ঋকবেদ, সামবেদ ও যজুর্বেদকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কেউ বলেন, এই তিনটি বেদ যজ্ঞের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত বলে অথর্ববেদকে তালিকার বাইরে রাখা হয়েছে। কিন্তু এই মতে ভ্রান্তি আছে।

কারন-

  • i) অভিচারাদি যাগে অথর্ববেদের মন্ত্রের বিনিয়োগ হয়।
  • ii)ত্রয়ী শব্দে ঋকমন্ত্র, সামমন্ত্র ও যজুর্মন্ত্রকে বোঝানো হয়েছে।

জৈমিনি বলেছেন, ঋকমন্ত্র ছন্দ ও পাদব্যবস্থা সমন্বিত। সামমন্ত্র গানের উপযুক্ত এবং অবশিষ্ট গুলি যজুঃ। এই তিনপ্রকার মন্ত্রই অথর্ব সংহিতায় আছে। সুতরাং, ত্রয়ী শব্দে অথর্ববেদকেও বুঝতে হবে।

অথর্বসংহিতার গঠন ও বিষয়বস্তু

অথর্বসংহিতার গঠনতন্ত্র

চারটি বৈদিক সংহিতার মধ্যে অথর্বসংহিতা চতুর্থ। পতঞ্জলির মতে অথর্বসংহিতার নয়টি শাখা থাকলেও বর্তমানে দুটি প্রাপ্ত – শৌনক ও পৈপ্পলাদ। অধিক প্রচলিত শৌনকশাখায় ৭৩১টি সূক্তে ৫৯৮৭ টি মন্ত্র আছে। সূক্তগুলি ২০টি কান্ডে, ৩৮টি প্রপাঠকে,৯০টি অনুবাকে বিভক্ত। এই সংহিতার ছয়ভাগের একভাগ গদ‍্য, বাকি অংশ পদ‍্যে নিবদ্ধ। সুপরিকল্পিতভাবে সম্পাদিত অথর্ব সংহিতাকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়।

অথর্বসংহিতার বিষয়বস্তু


অথর্বসংহিতার বিষয়বস্তু প্রথম ভাগ

প্রথম সাতটি কান্ড নিয়ে প্রথম ভাগ।

এর অন্তর্গত সূক্ত গুলি হল-


i) ভৈষজ‍্যানি-

এতে আছে রোগ নিরাময়ের জন্য প্রায় একশটি ঐন্দ্রজালিক ক্রিয়াদি। রোগের জনক হিসাবে কল্পিত রাক্ষস, পিশাচ ইত্যাদির বিরুদ্ধে ভিন্ন ভিন্ন মন্ত্র আছে। লতাগুল্মের মধ্যে প্রাচীন ঔষধের উল্লেখও আছে। তক্ননাশম্,শ্বেতকুষ্ঠনাশম্,জ্বরনাশম্ ইত‍্যাদি নামে পরিচিত ভৈষজ‍্যানি সম্ভবত কৌশিকসূত্রগুলির জনক।

iii) পৌষ্টিকানিঃ-

প্রধানত কৃষিজীবী, বণিক ও গোপালকদের সমৃদ্ধির জন্য এই সূক্ত গুলিতে গৃহনির্মাণ, হলকর্ষণ, বীজাধান, শুভবানিজ‍্য, সর্পভয়নিরসন ইত‍্যাদির জন্য কামনা করা হয়েছে।


iv) প্রায়শ্চিত্তানি-

চারিত্রিক পতন, ধর্মবিরোধ, যজ্ঞে ভ্রান্তি ইত্যাদির প্রায়শ্চিত্তের বিধান এখানে আছে।


v) স্ত্রীকর্মাণি-

ঈপ্সিত স্বামীলাভ, নবদম্পতির কল‍্যাণ,গর্ভধারণ,সুপ্রসব নারীসুলভ কামনার চরিতার্থতার প্রয়াস আছে।


vi) রাজকর্মাণি-

রাষ্ট্রের ঐক্য, উন্নতি ও নিরাপত্তার জন্য যুদ্ধ জয় ইত্যাদি বিষয়ে রচিত এই গ্রন্থগুলিতে রথ, শঙ্খ, যুদ্ধাস্ত্র ও যুদ্ধের বর্ণনা আছে।


vi) অভিচারিকাণি-

প্রতিশোধ বা স্বার্থসিদ্ধির কামনায় অন্যের অনিষ্ট সাধন এই মন্ত্রগুলির উদ্দেশ্য।


এছাড়া আছে ভূতাবেশ দূর করার শান্তিকানি, মৈত্রী সম্পাদনের সাংমনস‍্যানি।

অথর্বসংহিতার বিষয়বস্তু দ্বিতীয় ভাগ

অষ্টম থেকে দ্বাদশ কান্ড পর্যন্ত অংশ এর অন্তর্গত। এই ভাগে ব্রহ্ম, মধুবিদ্যা, অতিথি সংস্কার,গোমহত্ত্ব, ভূমিমহত্ত্ব ইত্যাদি বিষয় আলোচিত। বিরাটসূক্ত, আত্মসূক্ত, স্কম্ভসূক্ত ইত‍্যাদিতে ঔপনিষৎ ভাবনা আছে। অজসূক্ত, ওষধিসূক্ত, ঋষভসূক্ত ইত‍্যাদিতে সামান‍্য এক প্রতীক ঋষির কবিমানসকে রহস‍্যমুখর করে তুলেছে। কামসূক্ত ও প্রাণসূক্তে দার্শনিক ভাবনার প্রকাশ আছে। ব্রহ্মচর্যসূক্তে মানুষের গৌরবকে উচ্চ স্থান দেওয়া হয়েছে।

অথর্বসংহিতার বিষয়বস্তু তৃতীয় ভাগ

ত্রয়োদশ থেকে বিংশ কান্ড পর্যন্ত তৃতীয় ভাগ। ত্রয়োদশে রোহিত নামক আদিত্যের প্রসঙ্গ, চতুর্দশে বিবাহ প্রকরণ, পঞ্চদশে ব্রাত্য প্রশংসা। ষোড়শে শাস্তিস্বস্ত‍্যয়ন, সপ্তদশে আদিত্যের স্তুতি, অষ্টাদশে পিতৃমেধ প্রকরণ আছে। উনবিংশ কান্ডে দুঃস্বপ্ন নাশক যজ্ঞ, কাল, রাত্রি, নক্ষত্র, অভয়, শান্তি ইত্যাদি বিষয়ক অনেকগুলি ছোট ছোট সূক্ত আছে। আছে ঋকবেদের পরিবর্তিতকার পুরুষসূক্ত, বেদমাতার উল্লেখ।

বিংশকান্ডের অধিকাংশ মন্ত্র ঋকসংহিতার অষ্টম মন্ডল থেকে নেওয়া। ইন্দ্র অগ্নি সূর্য ইত্যাদি দেবতার সূক্তের দশটি কুন্তাপসূক্ত আছে।

অথর্বসংহিতার বিষয়বস্তু বৈশিষ্ট‍্য ও স্বাতন্ত্র‍্য

সংকলনের দিক থেকে অর্বাচীন হলেও অথর্ব সংহিতায় যে ধর্মের সন্ধান পাওয়া যায়, তা প্রাচীনত্বে ঋকবেদীয় ধর্মকেও হার মানায়। সায়ণ তিন বেদকে কেবল পারত্রিক ফলপ্রদ বললেও অথর্ববেদকে ঐহিক ও পারত্রিক উভয় প্রকার ফলপ্রদ বলেছেন। ভারতীয় চিকিৎসাবিদ্যার ইতিহাসে যাদুবিদ্যার উৎস হিসেবে ও দর্শনের বিকাশে এর ভূমিকা আছে। কালসূক্তেও বলা হয়েছে, পরমতত্ত্বই কাল নামে জগতের নিয়ন্তা।


অথর্বসংহিতা কাব্যধর্মীও।

কামসূক্ত ও প্রাণসূক্তে দর্শন ও কাব্যের মেলবন্ধন ঘটেছে। ভূমিসূক্তে “মাতা ভূমিঃ পুত্রো অহং পৃথিব‍্যাঃ”- ইত্যাদি উচ্চারণ মনকে প্রসারিত করে। অথর্বসংহিতা ভারতীয় ঐতিহ্যের আকরবিশেষ। আর্য ও আর্যেতর সভ্যতার যুক্তবেণী অথর্বসংহিতাতেই রয়েছে ভারতীয় গনচেতনার সার্থক আদিম প্রকাশ।

Leave a Reply

%d bloggers like this: