একনজরে পুরাণ সম্পর্কে আলোচনা | Discussion about Puranas (Mythology)

একনজরে পুরাণ সম্পর্কে আলোচনা | Discussion about Puranas (Mythology)

একনজরে পুরাণ


সূচনা:-

পুরাণ শব্দের অর্থ – প্রাচীন কাহিনি। পুরাণ বলতে অনেকে ইতিহাসকেও বোঝাতে চেয়েছেন। কিন্তু ইতিহাস’ ও পুরাণ সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইতিহাস হল অতীতের ঘটনা ; আর পুরাণ হল সুদূর অতীতের ঘটনা। শতপথব্রাহ্মণ, ছান্দ্যোগ্যোপনিষদ্ প্রভৃতি গ্রন্থে পুরাণকে পঞ্চমবেদ’ নামে অভিহিত করা হয়েছে।


পুরাণ সম্পর্কিত উক্তিবিশেষ

উক্তি:-অবস্থান / বক্তা :-
পুরাণস্য কল্পস্য পুরাণানি বিদুর্বুধাঃ।মৎস্যপুরাণ
পুরা নবং ভবতি যাঙ্কাচার্য
পুরাণেষ্বিতিহাসোঅয়ং পঠ্যতে বেদবাদিভিঃ মৎস্যপুরাণ
পুরা পূর্বস্মিন্ কালে ভবঃ হলায়ুধ
অত্রাপ‍্যুদাহরস্তীমমিতিহাসং পুরাতনম্।মহাভারত



রচয়িতা :-


মৎস্যপুরাণের একস্থানে বলা হয়েছে পুরাণসমূহ ব্রহ্মার নিকট হতে প্রকাশিত হয়েছে – পুরাণং সর্বশাস্ত্রাণাং প্রথমং ব্রহ্মণা স্মৃতম। আবার ভারতীয় ঐতিহ্য অনুসারে ব্যাসদেবই হচ্ছেন পুরাণসমূহের রচয়িতা – “অষ্টাদশপুরাণানি কৃত্বা সত্যবতীসুতঃ।
পশ্চাৎ ভারতমাখ্যানং চক্রে তদুপবৃংহিতম।” কারো কারো মতে পুরাণ বেদের মতোই অপৌরুষেয় এবং এগুলি শ্রতিরক্ষিত। পাশ্চাত্যপণ্ডিতগণ এপ্রসঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে পুরাণ বিশেষ কোনো একজনের রচনা নয় ; এটি বহু কবি-সাহিত্যিকদের লেখনীপ্রসূত।

রচনাকাল:-

পুরাণগুলি কোন একটি বিশেষ সময়ের রচনা নয়। দীর্ঘকাল ধরে পুরাণের শ্লোক সংযোজিত হয়েছে। মোটামুটিভাবে বলা যায় খ্রী.পু. চতুর্থ শতক থেকে খ্রী, সপ্তম শতকের বিভিন্ন সময়ে পুরাণগুলি রচিত হয়েছিল।

পুরাণের বৈশিষ্ট্য :-

বিভিন্ন পুরাণের বিষয়বস্তু থেকে পুরাণের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে একটি সাধারণ ধারণা গড়ে উঠেছে। বায়ু, কূর্ম, মৎস্য প্রভৃতি পুরাণে পুরাণের পাঁচটি লক্ষণ নির্দিষ্ট হয়েছে –
“সৰ্গশ্চ প্রতিসর্গশ্চ বংশো মন্বন্তরাণি চ।
বংশানুচরিতং চৈব পুরাণং পঞ্চলক্ষণম।।”

পুরাণের পাঁচটি লক্ষণ

অর্থাৎ ১, সর্গ (সৃষ্টি), ২. প্রতিসর্গ (প্রলয়ের পর পুনঃ সৃষ্টি), ৩. বংশ (দেবতা ও ঋষিদের বংশবর্ণন), ৪. মন্বন্তর (মনু পরিবর্তন) এবং ৫. বংশানুচরিত (রাজবংশের ইতিহাস কথন)।
এছাড়াও ভুবনবিস্তর, দানধর্মবিধি, শ্রাদ্ধকল্প, বর্ণাশ্রমবিভাগ, ইষ্টাপূর্ত ও দেবতাপ্রতিষ্ঠা – এই ছয়টি অতিরিক্ত লক্ষণের কথা বলা হয়েছে।
ভাগবতপুরাণ অনুসারে পুরাণের দশটি লক্ষণ – সর্গ, বিসর্গ, বৃত্তি, রক্ষা, অন্তর,বংশ, বংশানুচরিত, সংস্থা, হেতু এবং অপাশ্রয়।

একনজরে পুরাণ


বিষয়বস্তু :-


পুরাণ –

পুরাকালীন। প্রাচীন কাহিনি।

রচয়িতা

ব্রহ্মার কাছ থেকে প্রকাশিত – ‘পুরাণং সর্বশাস্ত্রাণাং প্রথমং ব্ৰহ্মণা স্মৃতম্। ব্যাসদেব কর্তৃক রচিত – ‘অষ্টাদশপুরাণানি কৃত্বা সত্যবতীসুতঃ’.

ইতিহাস ও পুরাণের পার্থক্য

ইতিহাস অতীতের ঘটনা, আর পুরাণ সুদূর অতীতের ঘটনা। ইতিহাসের প্রাচীন বীরপুরুষদের বীরব্যাঞ্জাত্মক কাহিনি, পুরাণের উপজীব্য সৃষ্টি, ধর্ম,আচার-ব‍্যবহার,প্রাচীন সামাজিক ব্যবস্থা প্রভৃতি।

রচনাকাল

খ্রী.পূ. চতুর্থ শতক থেকে খ্রীষ্টীয় সপ্তম শতক।

পুরাণের বিভাগ

দুটি ভাগ – (১) মহাপুরাণ, (২) উপপুরাণ।

মহাপুরাণ

ব্রাহ্মং পাদ্মং বৈষ্ণবং চ শৈবং ভাগবতং তথা।

অথান্যং নারদীয়ং চ মার্কণ্ডেয়ং চ সপ্তমম্।।

আগ্নেয়মষ্টমং চৈব ভবিষ্যং নবমং তথা।

দশমং ব্রহ্মবৈবর্তং লৈঙ্গমেকাদশং স্মৃতম।।

বারাহং দ্বাদশং চৈব স্কান্দং ছাত্র ত্রয়োদশম।

চতুর্দশং বামনং চ কৌর্মং পঞ্চদশং স্মৃতম।।

মাৎস্যং চ গারুড়ং চৈব ব্রহ্মাণ্ডঞ্চ ততঃ পরম্।

বিষয়বস্তু

সৃষ্টি, প্রলয়, দেবতাদের কথা, ঋষিদের বংশবর্ণন, মন্বন্তর, রাজবংশের ইতিহাস, বর্ণাশ্রমবিভাগ, দেবতাপ্রতিষ্ঠা, দান, তীর্থ, ব্রত, অবতারতত্ত্ব, ধর্ম, দর্শন, বাস্তুবিদ্যা, পদার্থবিদ্যা, ভূগোল, ইতিহাস, ব্যাকরণ প্রভৃতি সমস্ত জাগতিক বিষয় আলোচিত।

বৃহত্তম পুরাণ

স্কন্দ পুরাণ (৮১ হাজার শ্লোক)।

ক্ষুদ্রতম পুরাণ

কূর্ম পুরাণ (৫ হাজার শ্লোক)।

পঞ্চলক্ষণ

“সর্গশ্চ প্রতিসর্গশ্চ বংশো মন্বন্তরাণি চ।

বংশানুচরিতং চৈব পুরাণং পঞ্চলক্ষণম।।


অর্থাৎ ১. সর্গ (সৃষ্টি), ২. প্রতিসর্গ (প্রলয়ের পর পুনঃ সৃষ্টি), ৩. বংশ (দেবতা ও ঋষিদের বংশবর্ণন), ৪. মন্বন্তর (মনু পরিবর্তন) এবং ৫. বংশানুচরিত (রাজবংশের ইতিহাস কথন)।

ভাগবতের মতে দশলক্ষণ

১. সর্গ, ২. বিসর্গ, ৩. বৃত্তি, ৪. রক্ষা, ৫. অন্তর, ৬. বংশ, ৭. বংশানুচরিত, ৮. সংস্থা, মতে দশলক্ষণ ৯. হেতু এবং ১০. অপাশ্রয়।

পুরাণের ছয়টি গৌণ লক্ষণ

১. ভুবনবিস্তর, ২. দান-ধর্মবিধি, ৩, শ্রাদ্ধকল্প, ৪. বর্ণাশ্রমবিভাগ, ৫. ইষ্টাপূর্ত এবং ৬.দেবতাপ্রতিষ্ঠা।

ব্রাহ্ম বা রাজসিক পুরাণ

১. ব্রহ্মপুরাণ (২৪৫ অধ্যায়, ১৩৭৮৩টি শ্লোক), ২. ব্রহ্মাণ্ডপুরাণ (৪টি পাদ – প্রক্রিয়াপাদ, অনুষঙ্গপাদ, উপোদ্ধাতপাদ এবং উপসংহারপাদ; ১২০০০ শ্লোক), ৩. ব্ৰহ্মবৈবর্তপুরাণ (২৭৪টি অধ‍্যায়,১৮০০০ শ্লোক), ৪.মার্কণ্ডেয় পুরাণ(১৩৪টি অধ‍্যায়,৬৯০০টি শ্লোক), ৫,ভবিষ‍্যপুরাণ(৪টি পর্ব- প্রথম,দ্বিতীয়[৩ভাগ],তৃতীয় [৪ভাগ] এবং চতুর্থ, ১৪০০০ শ্লোক) এবং ৬. বামনপুরাণ (৬০০০ শ্লোক)।

বৈষ্ণব বা সাত্ত্বিক পুরাণ

১. ভাগবতপুরাণ (১২টি স্কন্ধ, ৩৩৫টি অধ্যায়, ১৮০০০ শ্লোক), ২. নারদীয়পুরাণ (২টি অর্ধ – পূর্বার্ধ এবং উত্তরার্ধ, ২০৭টি অধ্যায়, ২৫০০০ শ্লোক), ৩. বিষ্ণুপুরাণ (৬টি অংশ, ২১৩টি অধ্যায়, ৬০০০ শ্লোক), ৪. গরুড়পুরাণ (৩টি কাণ্ড – আচারকাণ্ড,প্রেত/ধর্মকাণ্ড এবং ব্রহ্ম/ মোক্ষকাণ্ড; ২৮৮টি অধ্যায়, ১৮০০০ শ্লোক), ৫, পদ্মপরাণ (৫টি খণ্ড – সৃষ্টিখণ্ড, ভূমিখণ্ড, স্বর্গখণ্ড, পাতালখণ্ড ও উত্তরখণ্ড; ৬৪০টি অধ্যায় ৫৫০০০ শ্লোক) এবং ৬. বরাহপুরাণ (২৩৮টি অধ্যায়, ১৪০০০ শ্লোক)।


শৈব বা তামসিক পুরাণ


১. শৈব বা শিব বা বায়ুপুরাণ (২টি অর্ধ – পূর্বার্ধ এবং উত্তরার্ধ, ১১২টি অধ্যায়, বিষয় ১১০০০ শ্লোক), ২. লিঙ্গপুরাণ (২টি ভাগ – পূর্বভাগ এবং উত্তরভাগ, ১৬৩টি অধ্যায়, তামসিক পুরাণ ১১০০০ শ্লোক), ৩. স্কন্দপুরাণ (৮টি খণ্ড – মাহেশ্বর, বৈষ্ণব, ব্ৰহ্ম, কাশী, অবন্তী, নাগর, প্রভাস এবং অম্বিকাখণ্ড, ৮১০০০ শ্লোক), ৪. অগ্নিপুরাণ (৩৮৩টি অধ্যায়, ১৫/১৬ হাজার শ্লোক), ৫.মৎস্যপুরাণ (২৯০টি অধ্যায়, ১৪০০০ শ্লোক) এবং ৬.কূর্মপুরাণ (২টি ভাগ – পূর্বভাগ এবং উত্তরভাগ, ৯৬টি অধ্যায়, ৫০০০ শ্লোক)।

পুরাণের নাম কিভাবে হয়েছে

“मद्वयं भद्वयं चैव ब्रत्रयं वचतुष्टयम्।

अनापलिङ्गकूस्कानि पुराणानि प्रचक्ष्यते।।”

मद्वयं = মকারাদি দুটি পুরাণ – মৎস্য ও মার্কণ্ডেয়।

भद्वये = ভকারাদি দুটি পুরাণ- ভবিষ‍্য ও ভাগবত।

ब्रत्रयम् =ব্রকারাদি তিনটি পুরাণ- ব্রহ্ম,ব্রহ্মাণ্ড ও ব্রহ্মবৈবর্ত।

बचतूष्टयम् = বকারাদি চারটি পুরাণ- বামন,বরাহ,বিষ্ণু ও বায়ু।

– অগ্নি,

ना – নারদীয়,

– পদ্ম,

लिङ – লিঙ্গ,

ग- গরুড়,

कु – কূর্ম,

स्क– স্কন্দ।

উপপুরাণ :-

মহাপুরাণের ন্যায় উপপুরাণের সংখ্যাও অষ্টাদশ – ১. সনৎকুমার, ২. নারসিংহ, ৩. বায়ু, ৪. শিবধর্ম, ৫, আশ্চর্য, ৬. নারদ, ৭. নন্দিকেশ্বর, ৮. কপিল, ৯. উশনস, ১০. কল্কি, ১১. বরুণ, ১২. কালিকা, ১৩. মহেশ্বর, ১৪. শাম্ব, ১৫, দেবী, ১৬. পরাশর, ১৭. মরীচি এবং ১৮, সূর্যপুরাণ। তবে এই পুরাণগুলির নামে বিস্তর মতভেদ লক্ষ্য করা যায়।

সমাজজীবনে প্রভাব :-

পুরাণ সমগ্ৰজাতিকে বিশেষত নারীজাতিকে ধর্মানুষ্ঠানের অধিকার দিয়েছে। পৌত্তলিকতার পূজা পৌরাণিক যুগ থেকেই প্রচলিত। আজও বিভিন্ন ধর্মানুষ্ঠানে সমাজে পুরাণপাঠের প্রচলন লক্ষ্য করা যায়। সর্বভূতে ঈশ্বরের উপস্থিতি পৌরাণিক ধর্মের সর্বশ্রেষ্ঠ অবদান।

ঐতিহাসিক মূল্য:-

প্রাচীন ভারতের ইতিহাস, বিভিন্ন রাজশক্তির কার্যাবলী ও রাজবংশের উত্থানপতন সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য পুরাণ থেকেই জানা যায়। শিশুনাগ, নন্দ, মৌর্য, অন্ধ্র, শুঙ্গ, গুপ্ত প্রভৃতি রাজবংশের ইতিহাস পুরাণের মাধ্যমে জানা যায়। এমনকি ইদানীন্তন ব্রিটিশশাসনের কথাও পুরাণে উল্লিখিত আছে। তবে পুরাণের বর্ণনায় অতিরঞ্জন থাকলেও ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে তার মধ্যে থেকে প্রকৃত ঐতিহাসিক তথ্য গ্রহণ করতে হবে।


সংস্কৃতসাহিত্যে পুরাণের প্রভাব :-

গ্রন্থনামশ্রেনিরচয়িতা বিষয়বস্তু
কুমারসম্ভবমহাকাব্যকালিদাসকার্তিকেয়ের জন্ম
শ্রীকণ্ঠচরিতমহাকাব্যমঙ্ককশিবকর্তৃক ত্রিপুরাসুর বধ
বালচরিতনাটকভাসভাগবতপুরাণের কৃষ্ণচরিত
মালবিকাগ্লিমিত্রনাটককালিদাসশুঙ্গবংশের কাহিনি
বিক্রমোর্বশীয়নাটককালিদাসপুরূরবা ও উর্বশীর কাহিনি।
অভিজ্ঞানশকুন্তলম্নাটককালিদাসপদ্মপুরাণের শকুন্তলোপাখ্যান
উত্তররামচরিতনাটকভবভূতিপদ্মপুরাণের প্রভাব
চন্ডকৌশিকনাটকক্ষেমীশ্বরহরিশ্চন্দ্রের কাহিনি
হরবিজয়মহাকাব্যরত্নাকরশিবের অন্ধকাসুর নিধন




1 thought on “একনজরে পুরাণ সম্পর্কে আলোচনা | Discussion about Puranas (Mythology)”

  1. এখানে Teachmint Apps এর সাহায্যে আধুনিক পদ্ধতিতে Online এ সংস্কৃত ব্যাকরণের শব্দরূপ, ধাতুরূপ, সন্ধি, অনুবাদ, কারক, সমাস, প্রত্যয়, অশুদ্ধি সংশোধন, এককথায় প্রকাশ ইত্যাদি Topic এর উপর পৃথক্ পৃথক্ Course করানো হয়। এবং PDF FILE পাওয়া যায়।
    আমাদের Telegram Group
    https://t.me/joinchat/SK-3xQOYL45lMzM1

    Reply

Leave a Reply

%d bloggers like this: