বেদাঙ্গ সম্পর্কে সম্পূর্ণ আলোচনা

বেদাঙ্গ সম্পর্কে সম্পূর্ণ আলোচনা করা হল। বেদাঙ্গের বিষয়বস্তু, প্রকারভেদ , বেদপুরুষের অঙ্গ প্রভৃতি আলোচনা করা হল।

একনজরে বেদাঙ্গ সম্পর্কে সম্পূর্ণ আলোচনা


বেদকে সুষ্ঠু ভাবে জানার জন্য প্রয়োজনীয় গ্রন্থাবলীকে বেদাঙ্গ বলে হয়। ইহা ছয় প্রকার শিক্ষা, কল্প, নিরুক্ত, ব্যাকরণ, ছন্দ ও জ্যোতিষ। এই প্রত্যেকটা বিভাগেরই বেদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সম্বন্ধ রয়েছে। কোনোটা সঠিক উচ্চারণের জন্য আবার কোনোটা অর্থ জানার জন্য। বেদাঙ্গকে বেদপুরুষের বিভিন্ন অঙ্গরূপে কল্পনা করা হয়েছে – শিক্ষা, কল্প, নিরুক্ত, ব্যাকরণ, ছন্দ ও জ্যোতিষকে যথাক্রমে বেদ পুরুষের নাক, হাত, কান, মুখ, পা ও চোখ রূপে কল্পনা করা হয়েছে। অর্থাৎ বেদ অধ্যায়নের সাহায্যকারী গ্রন্থগুলিকে বেদাঙ্গ বলা হয়।

বেদাঙ্গের বিষয়বস্তু-

বেদস্য অঙ্গানি অর্থাৎ বেদের অঙ্গ। বেদের সঠিক অর্থ জানার সহায়ক গ্রন্থই বেদাঙ্গ। বেদের অঙ্গ বেদাঙ্গ। মানুষের শরীরে বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নিয়ে পূর্ণাঙ্গ দেহ গঠিত, তেমনি বেদের কিছু অঙ্গ আছে যেগুলো দ্বারা সম্পূর্ণ বেদ গঠিত হয়।

বেদাঙ্গের প্রকারভেদ

ছয় প্রকার – (১) শিক্ষা (২) কল্প (৩) নিরুক্ত (৪) ব্যাকরণ (৫) ছন্দ ও (৬) জ্যোতিষ।

বেদপুরুষের অঙ্গ :-


“ছন্দঃ পাদৌ তু বেদস্য হস্তৌ কল্পোঅথ পঠ‍্যতে। জ্যোতিষাময়নং চক্ষুর্নিরুক্তং শ্রোত্রমুচ্যতে।। শিক্ষা ঘ্রাণং তু বেদস্য মুখং ব্যাকরণং স্মৃতম্।”


১. শিক্ষা (নাক) ২. কম্প (হাত) ৩. নিরুক্ত (কান) ৪, ব্যাকরণ (মুখ) ৫. ছন্দ (পা) ও ৬. জ্যোতিষ (চোখ)।

বেদাঙ্গের শিক্ষাগ্রন্থ:-

ছয়টি বেদাঙ্গের মধ্যে প্রথম হল শিক্ষা। বেদের সঠিক উচ্চারণ শিক্ষাগ্রন্থের আলোচ্য বিষয়। যে বেদাঙ্গ বেদের জ্ঞান,স্বর, মাত্রা প্রভৃতি মাত্রায় শিক্ষা দেয় তাই শিক্ষা। সুতরাং শিক্ষা হল বেদের ধ্বনিবিজ্ঞান।

ঋগ্বেদের শিক্ষা:- পাণিনীয় শিক্ষা।

সামবেদের শিক্ষা :- নারদ শিক্ষা, শাকটায়ন শিক্ষা।

যজুর্বেদের শিক্ষা:- যাজ্ঞবল্ক্য শিক্ষা, ব্যাস শিক্ষা, বশিষ্ঠ শিক্ষা, ভারদ্বাজ শিক্ষা, মাণ্ডব্য শিক্ষা।

অথর্ববেদের শিক্ষা:- মান্ডূকী শিক্ষা।

কল্প:-

বৈদিক যজ্ঞের আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা ও যোগ্য প্রণালীর সংক্ষিপ্ত প্রক্রিয়া হল কল্প। যাগ-যজ্ঞের নিয়মাবলী কল্পগ্রন্থের আলোচ্য বিষয়। বেদ শাখার মীমাংসা,ব‍্যাকরণ তত্ত্ব প্রভৃতি বিষয়ে আলোচ্য বিষয় হল কল্পসূত্র।

সূত্রসাহিত‍্য :- বৈদিক সাহিত্য ধারার যে অংশে যাগ যজ্ঞাদির বিবরণ বর্ণিত হয়েছে সেই অংশকে সূত্রসাহিত্য বলে।

প্রকারভেদ:-
সূত্রসাহিত্য চার প্রকার – শ্রৌতসূত্র, গৃহ্যসূত্র, ধর্মসূত্র ও শুলসূত্র।

শ্রৌতসূত্র:-
এখানে বৈদিক যাগযজ্ঞের বিধান সূত্রাকারে লিপিবদ্ধ আছে।

গৃহ‍্যসূত্র:- গার্হস্থ্য জীবনের ধর্মানুষ্ঠান, নানাবিধ সংস্কার প্রভৃতি বর্ণিত হয়েছে।

ধর্মসূত্র:-
বিভিন্ন ধর্মানুষ্ঠানের কর্তব্যাকর্তব্য, অনুষ্ঠানের সুফল এবং অনুষ্ঠান পরিহারের প্রত্যবায়।

শুল্বসূত্র:-
যজ্ঞীয়বেদীর পরিমাপক সূত্রের নাম শুল্ব। এর প্রতিপাদ্য বিষয় বিভিন্ন জ্যামিতিক পরিমাপ।

পঞ্চমহাযজ্ঞ:-
(১) ব্রহ্মযজ্ঞ (অধ্যয়ন ও অধ্যাপন)
(২) পিতৃযজ্ঞ (পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে তর্পণ) (৩) দেবযজ্ঞ (নানাবিধ হোম)
(৪) ভূতযজ্ঞ (পশুপাখিকে খাদ্যাদি দিয়ে তৃপ্ত করা)
(৫) নৃযজ্ঞ (অতিথিসেবা)

নিরুক্ত:-


বৈদিক মন্ত্রের বিভিন্ন শব্দের অর্থ হল জ্ঞানের জন্য যে শাস্ত্র অপরিহার্য তার নাম নিরুক্ত। আচার্য যাষ্ক নিরুক্তের রচয়িতা। কিন্তু বর্তমানে গ্রন্থটি লুপ্ত। একে বৈদিক শব্দ অভিধান বলে।

সংকলক – যাস্কাচার্য।

তিনটি কাণ্ড – নৈঘটুক, নৈগম ও দৈবত।

ব‍্যাকরণ:-


বেদ জানার জন্য ব্যাকরন অপরিহার্য।ব্যাকরণ শব্দগঠন ও ভাষা নিয়ন্ত্রণের শাস্ত্র। প্রাচীনকালে প্রতিশাখ‍্যগুলি ব‍্যাকরন গ্রন্থ হিসেবে ধরা হত। এর প্রয়োজন পাঁচটি – ‘রক্ষোহাগমলঘ্বসন্দেহাঃ প্রয়োজনম। অর্থাৎ রক্ষা (সন্ধি- সমাসের জ্ঞান), উহ (অধ্যাহার পরিবর্তন), আগম (আবশ্যিক নিয়ম), লঘু (ভাষার জ্ঞান), অসন্দেহ (সংশয় নিরসন)।

পাণিনীয় অষ্টাধ্যায়ী উল্লেখযোগ্য।

ছন্দ:-

বেদ মন্ত্র পাঠের জন্য এবং উচ্চারণের জন্য ছন্দ শাস্ত্রের প্রয়োজন। বৈদিক ছন্দ সাতটি। পিঙ্গলাচার্য রচিত ‘ছন্দসূত্রঃ বৈদিক ছন্দের গ্রন্থ।

কিন্তু লৌকিক ছন্দ অর্থাৎ বর্তমানে ছন্দের সংখ্যা অনেক পিঙ্গলের ছন্দ সূত্র প্রাচীন গ্রন্থ।

জ‍্যোতিষ:-

কাল নির্ণয়ের জন্য এর প্রয়োজন। বৈদিক কর্মের যথাযথ কাল নির্ধারণের জন্য জ্যোতিষ শাস্ত্রের জ্ঞান আবশ্যক রাশি নক্ষত্র তিথি প্রভৃতি জ্ঞান না থাকলে গৃহকর্ম ও শ্রৌত অনুষ্ঠান করা অসম্ভব হতো এই শাস্ত্রে কাল নক্ষত্র প্রভৃতি বর্ণিত রয়েছে।

জ‍্যোতিষ গ্রন্থ:- ঋগ্বেদের আর্চজ্যোতিষ, যজুর্বেদের যাজুষ জ্যোতিষ। রচয়িতা লগধাচার্য।

Leave a Reply

%d bloggers like this: